কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রতি বছর ১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত এক প্রস্তাবের মাধ্যমে এ দিবসটি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। ২০০৮ থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এটি পালন করা হচ্ছে।
মূলত ১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) গণতন্ত্রের নীতি, উপাদান ও অনুশীলনের ওপর একটি ‘সার্বজনীন ঘোষণা’ গ্রহণ করে। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং বিশ্বে গণতন্ত্রের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের জন্য জাতিসংঘ ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে।
গণতন্ত্র দিবসের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। সেইসঙ্গে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পরিবেশ বজায় রাখা, যা গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
পরিবর্তনশীল বিশ্বে গণতন্ত্র কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার একটি সার্বিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও গণতন্ত্রের পূর্ণ চর্চা, জবাবদিহিমূলক শাসন নিশ্চিতকরণ ও জনগণের শক্তির পুনর্বিকাশে এই দিবসটির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।
গণতন্ত্র কোনো সমাপ্ত প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক চর্চা। সব নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা বজায় রাখার মাধ্যমেই একটি টেকসই ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘এই দিবসটি গণতন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করা ও আইনের শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের শক্ত ভিত্তি দেওয়াকে সমর্থন করে। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের নীতি প্রচার ও সুসংহত করার উদ্দেশ্যে এই দিবসটি উদযাপন করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র অর্জনের সংগ্রামে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। জীবনদানকারী শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং আহতদের সমবেদনা জানাচ্ছি। আমি আজকের এ দিনে বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’
রিজভী বলেন, ‘এই দিবসের গুরুত্ব মানবাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সেবা ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সচেষ্ট হয়। গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকলে কোনো স্বৈরশক্তিই মাথাচাড়া দিতে পারে না, আর সে কারণে জনগণকে ক্রীতদাসে পরিণত করা সম্ভব হয় না।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে একদলীয় দুঃশাসনের কালো থাবা এখনও বিরাজমান। দেড় দশক ধরে বাংলাদেশেও নাগরিক স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকার উচ্ছেদ করে এক ভয়ঙ্কর আওয়ামী ফ্যাসিবাসী শাসন কায়েম ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘নানা কালাকানুণের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, ভিন্নমতের কারণে অনেকেই গুম, খুন, আইন বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছিল। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য আপসহীন যোদ্ধা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা ও সাজানো মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল।’
রিজভী বলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রতি দৃঢ় অঙ্গিকারবদ্ধ বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নামিয়ে আনা হয়েছিল মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়ার বর্বরোচিত অত্যাচার। দেশবাসী ১৬ বছর এক ভয়াবহ দুর্দিন অতিক্রম করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঐতিহাসিক রক্তস্নাত আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন হয়েছে।’
বাণীতে তিনি যোগ করেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারীর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পর এখন এদেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়েছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করে গণতন্ত্রকে একটি স্থায়ী রুপ দিতে হবে। গণতন্ত্রকে সচল রাখতে হলে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বজনীন শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র সম্ভব নয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘নারী ও পুরুষ অথবা অন্য কোনো লিঙ্গে সবার সমান অংশগ্রহণ এবং সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা লাভ করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-সমাজে। গণতন্ত্র লিঙ্গ ভেদে কারও প্রতি কোনো বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলতে পারে না, বরং সবার জন্য সমান আইনী ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আমরা দুঃসময় কাটিয়ে উঠে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছি, এখন কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার সার্বিক প্রচেষ্টায় আমাদেরকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।’