রাজধানীর দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পশ্চিম পাশের ঘুণ্টিঘর এলাকা। সেখানে অর্ধশত মানুষের আনাগোনা- কিশোর থেকে তরুণ, মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ এমনকী নারীও রয়েছেন কেউ কেউ। কারও হাতে কাঠের ও প্লাস্টিকের বাক্স কিংবা প্যাকেট, কেউবা আবার ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পকেট থেকে কাগজের পুরিয়া বের করে ক্রেতার হাতে দিয়ে অনায়াসে নেওয়া হচ্ছে টাকা।
দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে কোনো গ্রামীণ হাট বসেছে। তবে সেখানে কোনো নিত্যপণ্য নয়, চলছে জমজমাট মাদকের কারবার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টা প্রকাশ্যেই চলে এই মাদক কেনাবেচা, যার মধ্যে গাঁজার আধিক্যই সবচেয়ে বেশি। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
এর আগে গত শনিবার বিকেলে দয়াগঞ্জের ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় হঠাৎ মাদকবিরোধী অভিযান চালান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ওই অভিযানের একটি ভিডিও তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আপলোড করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে উচ্চস্বরে কিছু বলছেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় তার পাশ থেকে একজনকে ‘একেবারে গুলি করে দেব’ বলতে শোনা যায়। তাদের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন অনুসারী ছিলেন।
প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিমন্ত্রীর এই ধরনের অভিযান নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। এর রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন রোববার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে ওই এলাকার প্রকৃত চিত্র জানতে সেখানে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, আগের দিন অভিযানে কয়েকজন আটক হওয়ার পরও মাদক কারবারে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি; বরং আগের মতোই অবাধে চলছে কেনাবেচা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ মাদক ব্যবসা চলছে। তবে গত কয়েক মাসে এর মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে। ২৪ ঘণ্টাই সেখানে গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পাওয়া যায়। প্রতি পুরিয়া গাঁজা বিক্রি হয় ১২০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকার মাদক বিক্রি করেন, আর পাইকারদের বেচাকেনা লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
সেখানে কথা হয় এক নারী মাদক বিক্রেতার সঙ্গে। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘গাঁজা বিক্রি বন্ধ হলে পেটের টানে আমাকে এখানে দেখা যেত না। আমার নিজের সন্তানরাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।’
পাশ থেকে আরেক নারী যোগ করেন, ‘আমার স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে জীবন নষ্ট করেছে। এখন সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে আমিও এই ব্যবসায় নেমেছি।’
এলাকার সাধারণ মানুষ ও পথচারীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ক্রেতা ভেবে মাদক ব্যবসায়ীরা হাঁকডাক দেওয়ায় চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় নারী ও পথচারীদের।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কর্মরত স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানান, আগেও এখানে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হতো, কিন্তু ইদানিং তা মাত্রা ছাড়িয়েছে। অফিস যাতায়াতের সময় মাদক ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ডাকে চরম বিব্রত হতে হয়। বাধ্য হয়ে এখন আমরা এই পথ এড়িয়ে চলি।
এদিকে, গত শনিবারের অভিযানে পুলিশ নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগ করেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে অন্তত ৩০-৪০ বার বৈঠক করেও কোনো সুফল মেলেনি। জনবল ও গাড়িসংকটসহ নানা অজুহাত দেখায় পুলিশ। ইতোপূর্বে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের গুলিতে পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সে কারণেই তিনি নিজের নিরাপত্তায় অস্ত্র সঙ্গে রেখেছিলেন এবং কোনো গুলি বা কাউকে ভয় দেখাননি; বরং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খান জানান, ওই এলাকায় মাদক কেনাবেচা রোধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। যখনই যাই, একসঙ্গে ২০-৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, জামিনে বা নানা উপায়ে বেরিয়ে তারা আবার একই কারবারে জড়িয়ে পড়েন। মূলত স্থানটিতে ভাসমান মানুষের আনাগোনা বেশি হওয়ায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও তার সহযোগীদের আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে পুলিশ।
ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে এই ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনি ব্যত্যয় বা কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।