কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় পরিচিতি, একাধিকবার দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার ইতিহাস, অথচ এখন বিএনপির সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। পাবনার প্রকৌশলী ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেনকে ঘিরে এমন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। তার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারাও। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আসার পর জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের পক্ষ থেকে এসেছে পদ বাতিলের হুঁশিয়ারি।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) পাবনা জেলা পরিষদে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গীয় মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ড. ঈসমাইল হোসেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার অতীত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের মধ্যেই বিএনপির সহযোগী সংগঠনের বিভাগীয় আহ্বায়ক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন ড. ঈসমাইল হোসেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৫ (সদর) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে প্রচার-প্রচারণা চালান বলে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি। এ সময় তিনি দলীয় মনোনয়ন ফরমও সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা গেছে।বর্তমানে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের ৩ নম্বর সদস্য হিসেবে তার নাম রয়েছে বলে দাবি দলটির স্থানীয় নেতাদের। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করেই তিনি কীভাবে বিএনপির সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিএনপির স্থানীয় পর্যায়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে ঈসমাইল হোসেনের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবিত ফয়সাল রিজভী। তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেন কখনো দল থেকে পদত্যাগ করেননি।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঈসমাইল হোসেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুরুতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন তিনি এবং মামলার হুমকি দেন। পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তার বক্তব্য, ‘কে বা কারা পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্যের তালিকায় আমার নাম দিয়েছিল। আমি বিষয়টি জানার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। ২০২৩ সালের পর থেকে আমি আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই। মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়
তার এই বক্তব্যের বিপরীতে জেলা আওয়ামী লীগের নেতার দাবি, ঈসমাইল হোসেন দল থেকে পদত্যাগ করেননি। ফলে তার পদত্যাগের দাবি এবং দলীয় নেতাদের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা একজন নেতার বিএনপির সহযোগী সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা বিএনপির নেতারা। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা রয়েছে। সেই অবস্থানে এমন নিয়োগ কীভাবে হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পাবনা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ মাসুম বগা বলেন, ‘গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। দলে আওয়ামী লোকজনের অনুপ্রবেশ রোধে আমাদের দলের চেয়ারম্যান কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপরও ঈসমাইল সাহেব কীভাবে এই দলে এলেন, আমার জানা নেই। আমি দলীয় ফোরামে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করব।’
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবিএম ফজলুর রহমানও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘সমাজে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী থাকে, যারা সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সুবিধা নিতে চায়। এদের মূলত কোনো আদর্শিক জায়গা নেই। যিনি জেলা আওয়ামী লীগের রানিং কমিটির উপদেষ্টা এবং দলের মনোনয়নপ্রার্থী ছিলেন, তিনি বিএনপির মতো একটি দলের বিভাগীয় পদে কীভাবে আসীন হলেন, এটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।’
অন্যদিকে, জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার বলেন, ‘মুহাম্মদ ইসমাইলকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কেও অবগত নই। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা সত্য হলে বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমি এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দলের ফোরামে জানাব।’
বিতর্কটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের হাইকমান্ড। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত জানিয়েছেন, ঈসমাইল হোসেনের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় তাদের জানা ছিল না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ঈসমাইলের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের জানা ছিল না। বিষয়টি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তার এই রাজনৈতিক পরিচয় এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা প্রমাণিত হলে মুক্তিযোদ্ধা দলে এটিই হবে তার শেষ দায়িত্ব। তাকে আর এই সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করতে দেওয়া হবে না। ঢাকায় পৌঁছেই তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও পদ বাতিলের নোটিশ ইস্যু করা হবে।’
ফলে ড. ঈসমাইল হোসেনের রাজনৈতিক অতীত, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা যাচাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে আওয়ামী লীগ নেতার দাবি, তিনি পদত্যাগ করেছেন; অন্যদিকে দলটির স্থানীয় নেতার বক্তব্য, তিনি পদত্যাগ করেননি। এই বিরোধের নিষ্পত্তি এবং কেন্দ্রীয় সংগঠনের ঘোষিত তদন্ত ও সাংগঠনিক পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর পাবনার রাজনৈতিক অঙ্গনের।